নির্বাচন নিয়ে বিএনপির যে কঠিন ভাবনা, আসতে পারে সফলতা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ দেশব্যাপী জোর প্রচারণা চালালেও বিএনপি খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে দৌড়ঝাঁপে ব্যস্ত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিলেটে হযরত শাহ জালাল (র.) ও হযরত শাহ পরান (র.) এর মাজার জিয়ারত করে গত ৩০ জানুয়ারি নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। এরপর তিনি বিভাগীয় এবং জেলা শহরে সফর অব্যাহত রেখেছেন।

আর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া একটি মামলার রায়কে সামনে রেখে গত ৫ ফেব্রুয়ারি হযরত শাহ জালাল (র.) ও হযরত শাহ পরান (র.) এর মাজার জিয়ারত করতে সিলেটে যান। ওই দিন সকালে রওনা দিয়ে বিকাল সাড়ে ৪টায় তিনি সিলেট সার্কিট হাউসে পৌঁছান। এরপর সার্কিট হাউসে দুপুরের খাবার খান। পরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে হযরত শাহ জালাল (রঃ) ও শাহ পরান (রঃ) এর মাজার জিয়ারত করেন বিএনপি চেয়ারপারসন।

তখন অনেকে বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনী প্রচারণার এক সপ্তাহের মধ্যেই খালেদা জিয়া কৌশলে সিলেট থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন। কিন্তু খালেদা জিয়া সিলেটে কোনো সমাবেশ করেননি। ওই দিন ৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার দিকে খালেদা জিয়া আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে সিলেট ত্যাগ করেন। পরে ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ে খালেদা জিয়ার ৫ বছরের কারাদণ্ড হয়। এরপর থেকেই তিনি এখন পর্যন্ত কারাগারে আছেন।

খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর বিএনপি নেতাকর্মীরা তার মুক্তি বিষয়ে আইনি এবং রাজনৈতিক -দুই প্রক্রিয়ায়ই সোচ্চার রয়েছেন। খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ, মানববন্ধন, অনশন, কালো পতাকা প্রদর্শন এবং গণস্বাক্ষরসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন।

অন্যদিকে আইনিভাবেও তারা খালেদার মামলা মোকাবেলা করছেন। খালেদা জিয়াকে কারাদণ্ড দেওয়ার পর নিম্ন আদালত থেকে তার মামলার নথি পেতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি সময় লাগে আইনজীবীদের। এরপর নথি পেলে খালেদার আইনজীবীরা হাইকোর্টে আপিল করেন। আপিলের শুনানির পর বিচারক কোনো আদেশ না দিয়ে নিম্ন আদালত থেকে মামলার নথি তলব করেন।

মামলার নথি আসতে ১৫ দিন সময় লাগে। পরে খালেদা জিয়াকে চারটি কারণে চার মাসের জামিন দেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের ওই জামিন আদেশের স্থগিত চেয়ে চেম্বার আদালতে লিভ টু আপিলের আবেদন করেন রাষ্ট্রপক্ষ এবং দুদকের আইনজীবীরা। পরে বিচারক ওই আবেদন শুনানির জন্য আপিল বিভাগের পূর্ণ বেঞ্চে পাঠান। পরে আপিল আদালত দুদক এবং রাষ্ট্রপক্ষের লিভ টু আপিল গ্রহণ করেন এবং খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন আবেদনের ওপর ৮ মে পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দেন।

সর্বশেষ খালেদা জিয়ার মামলার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার জন্য ব্রিটেনের প্রখ্যাত আইনজীবী লর্ড কারলাইলকে নিয়োগ দেয় বিএনপি। কারলাইল খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের বিভিন্ন ধরনে সহয়তা দেবেন এবং বিচার কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ড মেনে চলা হচ্ছে কিনা- সে বিষয়টিও লক্ষ্য করবেন। খালেদা জিয়া দীর্ঘ আইনি প্যাঁচে পরে জামিন পাওয়ার জন্য আইনজীবীদের মাধ্যমে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি কারাগারে থাকার কারণে দলের কার্যক্রমে অনেকটা স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও তা ঠিকমতো পালন করতে পারছেন না দলের নেতাকর্মীরা। কেননা তারা কর্মসূচি পালন করতে গেলেই পুলিশ তাদের সঙ্গে মারমুখী আচরণ করছে।

সম্প্রতি নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপির কর্মসূচিতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে এবং জলকামান দিয়ে পানি মারে। এতে দলের অনেক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। আটক করা হয়েছে বেশ কয়েকজনকে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ জোর প্রচারণা চালালেও বিএনপি খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে ব্যস্ত।

আগামী ৩১ মার্চ খুলনা এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের তফসিল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। ওই নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে কিনা -সে বিষয়টিও এখন পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। দলীয় নেতাকর্মীরা এ নিয়ে কিছু বলছেনও না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন গতকাল খোলা কাগজকে বলেন, এখনো তো তফসিল ঘোষণা হয়নি। আগে ঘোষণা হোক। তাছাড়া বিষয়টি নিয়ে এখনো আমাদের দলীয় ফোরামে কোনো আলোচনা হয়নি। সময় আসুক। দেখি আমরা কী করব।

আরো পড়ুন>> বিদেশীদের যৌন কাজের টার্গেট হচ্ছে রোহিঙ্গা মেয়েরা

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অল্পবয়সী মেয়েরা বিদেশীদের যৌন কাজে ব্যবহারের টার্গেট হয়ে উঠছে। কক্সবাজার থেকে যৌন ব্যবসার জন্য রোহিঙ্গা মেয়ে ও শিশুদের পাচার করা হচ্ছে। বিদেশী খদ্দের সেজে এমন তথ্য পেয়েছে একটি দল।

একটি অনুসন্ধানী দল এবং ফাউন্ডেশন সেন্টিনেল নামের অলাভজনক একটি প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি কক্সবাজার গিয়েছিল এমন ব্যবসার সাথে জড়িত নেটওয়ার্ক গুলো সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে। খবর-বিবিসি

অনুসন্ধান শুরুর পর স্থানীয় ছোট হোটেল ও সৈকতের রেজর্ট থেকে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই দালালদের টেলিফোন নম্বর যোগাড় হয়ে গেলো। এই হোটেল ও রিসোর্টে যৌন কর্মকাণ্ডের জন্য রুম ভাড়া পাওয়া যায়।

পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েই অনুসন্ধানী দলটি এসব নম্বরে ফোন করে দালালদের কাছে জানতে চায় বিদেশীদের জন্য অল্পবয়সী রোহিঙ্গা মেয়ে পাওয়া যাবে কিনা।

এর উত্তরে টেলিফোনের ওপার থেকে এক দালাল জানায় ‘অল্পবয়সী মেয়ে আছে কিন্তু রোহিঙ্গা মেয়ে কেন খোজা হচ্ছে? ওরা তো খুব নোংরা’।

আরো অনুসন্ধানে দেখা গেলো রোহিঙ্গা মেয়েদের সেখানে সবচাইতে সস্তায় পাওয়া যাচ্ছে। পতিতাবৃত্তির ক্ষেত্রেও তারা সেখানে সবচাইতে নিচের সারিতে রয়েছে।

অনুসন্ধানী দলটি দালালকে জানালো যত দ্রুত সম্ভব তারা এসব মেয়েদের সাথে রাত কাটাতে চায়। খুব দ্রুতই বিভিন্ন দালালদের কাছ থেকে রোহিঙ্গা মেয়েদের ছবি আসতে শুরু করলো। যাদের বয়স ১৩ থেকে ১৭ বছর। বলা হল ছবির মেয়েদের পছন্দ না হল এমন আরো বহু আছে। চাইলেই পাওয়া যাবে। এভাবে এত রোহিঙ্গা মেয়ে পাওয়া গেলো যা খুবই ভয়াবহ।

যখন খদ্দের থাকে না তখন এসব মেয়েরা অনেক সময় দালালদের বাড়িতে রান্নাবান্না বা ধোয়ামোছার কাজ করে বলেও জানা গেলো।

অল্পবয়সী মেয়েরা ‘ঝামেলা’ করে বলে তাদের দ্রুত বিদায় করে দেয়া হয় বলে জানা গেছে।

দালালদের সাথে কথাবার্তার রেকর্ডিং ও ভিডিও স্থানীয় পুলিশকেও দেয়া হয়েছে। পুলিশের একটি ছোট দলকে অভিযানে দেয়া হয়।

দালালদের একজনকে পুলিশ খুব দ্রুতই চিনে ফেলে। বলা হয় সে সম্ভবত পুলিশেরই তথ্য দাতা অথবা অপরাধী কেউ হবে।

অভিযানের অংশ হিসেবে বিবিসির দলটি কক্সবাজারের ঐ দালালকে ফোন করে। ছবিতে দেখা দুটো মেয়েকে রাত আটটায় শহরের একটি নামি হোটেলে পাঠাতে বলা হয়।

ফাউন্ডেশন সেন্টিনেলের এক কর্মী অনুবাদক হিসেবে হোটেলের বাইরে অপেক্ষা করছিলো।

হোটেলের কার পার্কে অপেক্ষা করছিলো পুলিশ। রাত আটটার দিকে বেশ কিছু ফোন কলের পর একটি গাড়িতে করে ড্রাইভারের সাথে ছবিতে দেখা মেয়ে দুটিকে পাঠানো হয়।

বিদেশী খদ্দের সেজে থাকা ব্যক্তিটি জানতে চায় আজ রাতের পরে আরো মেয়ে পাওয়া যাবে কিনা। গাড়ির চালক সম্মতি সূচক মাথা নাড়ে। টাকা হস্তান্তরের পরই পুলিশ গাড়ির চালককে গ্রেফতার করে। মেয়ে দুটিকে উদ্ধার করে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। দারিদ্র আর পতিতাবৃত্তির জালে যেন এই মেয়ে দুটি আটকে গেছে। তারা জানায় পতিতাবৃত্তি ছাড়া জীবন চালানো তাদের জন্য খুব কঠিন।

আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পর্যায়ে নারী ও শিশু পাচারে খুব শক্তিশালী নেটওয়ার্ক দরকার হয়। এ ক্ষেত্রে ইন্টারনেট এখন যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

রোহিঙ্গা মেয়েদের বাংলাদেশের ঢাকা, নেপালের কাঠমান্ডু ও ভারতের কোলকাতায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

কোলকাতায় ব্যস্ত যৌন ব্যবসায় এরকম অনেক নারীদের পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা করে দেয়া হচ্ছে।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে মিলেমিশে যাচ্ছে তারা। এর পর তাদের আজ খোঁজ মিলছে না।

ঢাকায় পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটে গিয়ে জানা গেলো কিভাবে ইন্টারনেটের সহায়তায় পাচারকারীরা মেয়েদের পাচার করে।

এজন্য গড়ে উঠেছে নানা ফেইসবুক পাতা ও এনক্রিপটেড বা গোপন ওয়েবসাইট।

এমন ওয়েবসাইটও পাওয়া গেলো যেখানে কিভাবে রোহিঙ্গা মেয়েদের ব্যবহার করা যায় সেনিয়ে ধাপে ধাপে তথ্য দেয়া হয়েছে।

কিভাবে ধরা পরার হাত থেকে বাঁচা যায়, কোন এলাকায় সবচাইতে বেশি শিশু পাওয়া যায় এমন সব তথ্য দিয়েছে এক ব্যক্তি।

এই ওয়েবসাইটটি পুলিশ সরিয়ে ফেলেছে। তবে তার আগে সেটি যাচাই করে জানা গেছে কিভাবে শিশুকামী ও পাচারকারীদের টার্গেট হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা শিশু ও নারীরা।

বাংলাদেশে নতুন সেক্স ইন্ডাস্ট্রি গড়ে না উঠলেও যৌনকর্মী হিসেবে কাজের জন্য মেয়ে সরবরাহ বেড়ে গেছে। আর সেটির অন্যতম শিকার রোহিঙ্গা মেয়েরা।

দুই কিশোরীর করুণ গল্প

মিয়ানমারে পরিবারের লোকজনের হত্যাকাণ্ডের পর চৌদ্দ বছর বয়সী আনোয়ারা পালিয়ে বাংলাদেশে আসেন।

বিপদগ্রস্ত এই কিশোরীর সেসময় সাহায্য খুবই দরকার ছিল। আর এই অসহায়ত্বের সুযোগটিই নিয়েছে পাচারকারীরা।

আনোয়ারা বলেন, ‘একদিন একটি গাড়িতে করে কয়েকজন মহিলা এলো। তারা জানতে চাইলো আমি তাদের সাথে যাবো কিনা’।

তাদের প্রতিশ্রুতি ছিল নতুন জীবনের। তাদের সাথে যেতে রাজি হওয়ার পর আনোয়ারাকে গাড়িতে তোলা হল এবং কক্সবাজার নিয়ে যাওয়া হল।

তিনি বলেন, ‘খুব বেশিক্ষণ হয়নি তার আগেই ওরা আমার কাছে দুটো ছেলে নিয়ে এলো। তারা আমাকে ছুরি দেখালো। পেটে ঘুষি মারলো। আমি রাজি হচ্ছিলাম না দেখে ওরা আমাকে মারতে থাকলো। এক পর্যায়ে ওরা আমাকে ধর্ষণ করলো।’

বাংলাদেশের কক্সবাজারে ক্যাম্পগুলোতে নারীদের যৌন নির্যাতন ও যৌন পেশায় জড়িয়ে পরার এমন অনেক ঘটনার বর্ণনা পাওয়া গেছে।

অল্প বয়সী নারী ও শিশুরা এর মূল টার্গেট। বিপদগ্রস্ত এই নারী ও শিশুদের মূলত কাজের লোভ দেখিয়ে ক্যাম্প থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

ক্যাম্পে রোহিঙ্গা শিশু ও তাদের অভিভাবকরা বলছেন, দেশের বাইরে কাজ, রাজধানী ঢাকায় বাড়িঘরে গৃহকর্মীর কাজ বা হোটেলে কাজের অনেক প্রস্তাব আসছে তাদের কাছে।

মারাত্মক ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে বিশৃঙ্খল পরিবেশ পাচারকারীদের সুযোগ যেন আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

মাসুদা নামের আর এক কিশোরী তার কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে বলছেন, ‘আমি জানতাম আমার কপালে কি আছে। যে মহিলা আমাকে কাজ দেবার কথা বলেছিল সে একজন রোহিঙ্গা। অনেকদিন আগে এখানে এসেছে। সবাই জানে যে সে লোকজনকে যৌন কাজে সহায়তা করে। আমার কোনো উপায় ছিল না কারণ এখনো আমার জন্য কিছুই নেই’।

রোহিঙ্গাদের জন্য জীবনের ভরসা নেই। ক্যাম্পের জরাজীর্ণ জীবনই তাদের ভবিষ্যৎ। তা থেকে বাঁচতে চেয়েছিলেন মাসুদা। এখন তিনি একটি স্থানীয় এনজিওর তত্ত্বাবধানে রয়েছেন।

মাসুদা বলেন, ‘আমার পরিবার নিখোঁজ হয়ে গেছে। আমার কোন অর্থকড়ি নেই। মিয়ানমারে আমি ধর্ষণের শিকার হয়েছি। আমি একসময় আমার ভাইবোনের সাথে খেলা করতাম। এখন খেলা কাকে বলে সেটাই ভুলে গেছি।’