যে কারণে ধারা টি বাদ দিয়েছে বিএনপি

দল ভাঙার আশঙ্কায় গঠনতন্ত্রের একটি ধারা বাদ দিয়েছে বিএনপি। সংশোধিত গঠনতন্ত্র রোববার নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছে দলটি। বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই সংশোধনীর কথা নিশ্চিত করেন।

গতকাল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদার (সিইসি) কাছে সংশোধিত গঠনতন্ত্র জমা দেয়। তবে এ বিষয়ে নজরুল ইসলাম খান কিছু বলতে রাজি হননি।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন, দল ভাঙার চেষ্টায় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হতে পারে এই আশঙ্কায় গঠনতন্ত্রের একটি ধারা বাদ দেয়া হয়েছে। সংশোধিত গঠনতন্ত্র রোববার নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়া হয়েছে।

বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৭ নম্বর ধারার ‘ঘ’তে বলা ছিল, ‘সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ বা কুখ্যাত বলে পরিচিত ব্যক্তি’ বিএনপির কোনো পর্যায়ের কমিটির সদস্য কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থীপদের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, তাঁদের কাছে তথ্য আছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপিকে ভাঙতে সরকারের একটি মহল থেকে চেষ্টা-তৎপরতা চালানো হবে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ের পর এই তৎপরতা গতি পেতে পারে।

এই মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা হলে ‘দুর্নীতিপরায়ণ’ ব্যক্তি দলের সদস্যপদের অযোগ্য হবেন বলে যে কথাটি গঠনতন্ত্রে আছে, তা সামনে এনে ওই মহল বিএনপিতে বিভক্তি সৃষ্টির জন্য দলের একটা অংশকে ব্যবহার করতে পারে। এই আশঙ্কার কারণে গঠনতন্ত্রের ৭ ধারাটি তুলে দেওয়া হয়েছে।

২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে গঠনতন্ত্রে কিছু সংশোধনীর প্রস্তাব পাস হয়। আগের গঠনতন্ত্রের ৭ (ঘ) ধারাটি ছিল বলে জানা গেছে। কিন্তু এত দিন দলটি নির্বাচন কমিশনে গঠনতন্ত্র জমা দেয়নি। এ নিয়ে নির্বাচন কমিশন বিএনপিকে চিঠিও দেয়। ১ বছর ১০ মাস পর ওই ধারা বাদ দিয়ে গতকাল গঠনতন্ত্র জমা দিল দলটি।

বিএনপির গঠনতন্ত্রে ৭ নম্বর ধারায় ‘কমিটির সদস্যপদের অযোগ্যতা’ শিরোনামে বলা আছে, ‘নিম্নোক্ত ব্যক্তিগণ জাতীয় কাউন্সিল, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, জাতীয় স্থায়ী কমিটি বা যেকোনো পর্যায়ের যেকোনো নির্বাহী কমিটির সদস্যপদের কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থীপদের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।’ তাঁরা হলেন: (ক) ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ নম্বর ৮-এর বলে দণ্ডিত ব্যক্তি। (খ) দেউলিয়া, (গ) উন্মাদ বলে প্রমাণিত ব্যক্তি, (ঘ) সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ বা কুখ্যাত বলে পরিচিত ব্যক্তি।

অবশ্য গঠনতন্ত্রের ৩-এ ‘সদস্য পদ লাভের যোগ্যতা’ ও ‘সদস্য পদ লাভের অযোগ্যতা’ ধারাটি বলবৎ আছে। তাতে বলা হয়, বাংলাদেশের আইনানুগ নাগরিক নন, এমন কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সদস্য হতে পারবেন না। বাংলাদেশের স্বাধীনতায়, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার বিরোধী, গোপন সশস্ত্র রাজনীতিতে বিশ্বাসী, সক্রিয়ভাবে-সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা সমাজবিরোধী ও গণবিরোধী কোনো ব্যক্তিকে সদস্যপদ দেওয়া হবে না।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন নেতা বলেন, ৩ নম্বর ধারার নির্দেশনাই দলের যেকোনো কমিটির সদস্য ও সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থীপদের অযোগ্যতা হিসেবে ধরে নেওয়া হবে।

ধারাবাহিক বৈঠক, আন্দোলনের বার্তা

বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘিরে আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এই মামলায় দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার সাজা হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিতে সারা দেশে নেতা-কর্মীদের বার্তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের জন্য ধারাবাহিক বৈঠক করছে দলটি।

শনিবার রাতে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়। এরপর গতকাল সকালে গুলশানের কার্যালয়ে বিএনপির সঙ্গে দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাদের এবং রাতে ২০-দলীয় জোটের শরিকদের সঙ্গে বৈঠক করেছে দলটি।

আজ সোমবার রাতে আবার বৈঠকে বসবে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটি। ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করবে।

জানা গেছে, ২০ দলের বৈঠকে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া আন্দোলনের জন্য শরিকদের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। এর বাইরে চারদলীয় জোটের এক সময়কার নেতা মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টিকে (একাংশ) ২০-দলীয় জোটে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে কথা হয়।

শনিবার রাতে দলের স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তের আলোকে ৫০২ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভার প্রস্তুতিও চলছে। ৩ ফেব্রুয়ারি এই সভা হতে পারে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সামনে নির্বাচন। এই লক্ষ্যে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপির চেয়ারপারসনের মামলার রায় আছে। সব মিলিয়ে দল গোছানোর প্রস্তুতির বিষয় আছে। সে জন্যই এসব বৈঠক।

Leave a Reply